সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪ | ৩ আষাঢ় ১৪৩১
ad
‌‘গাজা দখল ইসরাইলের লক্ষ্য নয়’-নেতানিয়াহুর এই দাবির রহস্য
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট করা হয়েছে : ০৯:২৩ পিএম, ১০ নভেম্বর ২০২৩

জাতিগত শুদ্ধি অভিযান ও পোড়ামাটি নীতির অংশ হিসেবে গাজায় নির্বিচার হামলা ও হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছে দখলদার ইসরাইল।

গাজার হাসপাতালগুলোর অংশ-বিশেষ ও এসব হাসপাতালের আশপাশে বোমা বর্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। গাজার সব অঞ্চলের ওপর নির্বিচারে বোমা বর্ষণ অব্যাহত রেখে প্রায় ১১ হাজার বেসামরিক ফিলিস্তিনিকে হত্যার পর ইসরাইল এখন বলছে প্রতিদিন চার ঘণ্টা ধরে হামলা বন্ধ রাখবে ইসরাইলি বাহিনী। হামলা বিরতি কার্যকর করার তিন ঘণ্টা আগে জানিয়ে দেয়া হবে যাতে উত্তর-গাজার জনগণ দক্ষিণ গাজায় চলে যেতে পারেন। উত্তর গাজা থেকে এ জন্য দু'টি করিডোর বা সড়ক খোলা রাখার সুযোগ দেবে ইসরাইল।

নেতানিয়াহু বলেছেন, গাজা দখলে রাখার কোনো উদ্দেশ্য ইসরাইলের নেই!

ইসরাইলি হামলায় নিহতদের বেশিরভাগই তথা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই শিশু ও নারী। ইসরাইলি হামলায় প্রায় ২৭ হাজার ফিলিস্তিনি আহত হয়েছে।

এদিকে ইসরাইল পশ্চিম তীরের জেনিন শরণার্থী শিবিরেও হামলা জোরদার করেছে। সেখানে ইসরাইলি হামলায় অনেক ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন।

ইসরাইলের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে বলে মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তিগুলো ইসরাইলকে গণহত্যা ও যুদ্ধ-অপরাধ চালিয়ে যেতে উৎসাহ যুগিয়েছে। ইসরাইলকে সামরিক সাহায্য দেয়াও জোরদার করেছে মার্কিন সরকারসহ কয়েকটি পশ্চিমা সরকার। অথচ দখলদার ইহুদিবাদীদের ওপর হামাসের হামলা ছিল গত প্রায় ৭৫ বছর ধরে সংঘটিত সন্ত্রাসী ইসরাইলি বাহিনী ও দখলদারদের নিয়মিত হত্যাযজ্ঞসহ সব ধরনের অপরাধযজ্ঞের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। মুসলমানদের প্রথম কিবলা আল-আকসা মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘন ও এই মসজিদ চত্বর ফিলিস্তিনিদের ওপর আগ্রাসী তৎপরতা চালিয়ে আসার বিরুদ্ধেও হামাস বহুবার ইসরাইলকে সতর্ক করে দিয়েছিল।

এ অবস্থায় গত ৭ অক্টোবরে হামাসের পরিচালিত বীরত্বপূর্ণ অভিযানের জবাবে ইসরাইল কেবলই বেসামরিক ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে আসছে যার বেশিরভাগই হচ্ছে শিশু ও নারী। ইসরাইল গাজার ওপর খাদ্য, পানীয়, জ্বালানী ও ওষুধসহ সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে সেখানে বহু সেনা ও ট্যাংক নিয়ে স্থল-অভিযান চালিয়েও হামাসের সেনাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারছে না। বরং হামাসের পাল্টা হামলায় ইসরাইলের বহু ট্যাংক ধ্বংস ও বহু ইসরাইলি সেনা হতাহত হওয়ার পর ইসরাইল এখন বলছে যে গাজা দখলে রাখা তাদের উদ্দেশ্য নয়! তবে ইসরাইল হামলায় বিরতি দেয়ার বিনিময়ে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হাতে আটক ইসরাইলি সেনা ও বন্দিদের মুক্তির দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধারা বলছেন ইসরাইলি কারাগারে আটক সব ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেয়া ছাড়া তারা ইসরাইলি বন্দিদের মুক্তি দেবেন না যদিও মানবিক কারণে তারা কয়েকজন বয়স্ক ও অসুস্থ ইসরাইলিকে মুক্তি দিয়েছেন এবং আরও দু-একজন ইসরাইলিকে একই কারণে মুক্তি দিতে চাচ্ছেন।

ওদিকে বিশ্বজুড়ে ইসরাইলি বর্বরতা, গণহত্যা ও যুদ্ধ-অপরাধের নিন্দা জানিয়ে এবং অবিলম্বে ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞ বন্ধের দাবিতে লক্ষ-কোটি মানুষের গণ-বিক্ষোভ হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমা সরকারগুলো ইসরাইলের ওপর কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগের প্রয়োজন অনুভব করেনি। যদিও মার্কিন সরকার ইরাক ও সিরিয়ায় তাঁর সেনা-ঘাঁটিগুলোতে প্রতিরোধ-গোষ্ঠীগুলোর হামলার প্রেক্ষাপটে ইসরাইলকে স্থায়ী যুদ্ধ-বিরতির পরিবর্তে সাময়িক মানবিক যুদ্ধ-বিরতি পালন করতে খুব নরম সুরে আহ্বান জানিয়েছে! গত ৪ নভেম্বর ওয়াশিংটনে ইসরাইল-বিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেয় তিন লাখেরও বেশি মানুষ। গত সাত নভেম্বর হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র জন কিরবি বলেছিলেন, ইসরাইল কত বেশি সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক হত্যা করবে সে বিষয়ে কোনো লাল-সীমানা বা নির্দিষ্ট সংখ্যার সীমা নেই। মার্কিন সরকার ইসরাইলকে সমর্থন যুগিয়ে যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মুসলিম ও আরব বিশ্বও ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞের জবাবে সম্মিলিত কোনো কঠোর পদক্ষেপ এখনও নিতে পারেনি। কেবল ইরান, ইয়েমেন ও লেবানন প্রতিরোধ যুদ্ধের পক্ষে এবং গাজায় ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞ বন্ধের জন্য জোরালোভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

অবশ্য পশ্চিমা শিবিরের দু-একটি সরকার বা নেতৃস্থানীয় কর্মকর্তা ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। বেলজিয়ামের উপপ্রধানমন্ত্রী ও স্পেনের সামাজিক অধিকার বিষয়ক মন্ত্রী আয়োনি বেলাররা গাজায় ইসরাইলের বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। মিসেস আয়োনি বেলাররা বলেছেন, ইউক্রেনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ব্যাপক উচ্চবাচ্য করা হলেও ইসরাইলি বোমা বর্ষণের শিকারদের নিয়ে বোবা-নিরবতা বিরাজ করছে! তিনি ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও দাবি জানান। ইসরাইলি নেতাদের আন্তর্জাতিক যুদ্ধ অপরাধ আদালতে নেয়ার ওপরও জোর দেন তিনি। একই ধরনের কথা বলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। দক্ষিণ আফ্রিকা এরই মধ্যে ইসরাইল থেকে তাদের রাষ্ট্রদূত ফিরিয়ে এনেছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কর্মকর্তারা গাজায় ইসরাইলের নির্বিচার হামলাকে যুদ্ধ-অপরাধ বলে উল্লেখ করছেন। বাসস্থানের অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের কর্মকর্তা বালাকৃষ্ণ রাজাগোপাল বলেছেন, গাজাকে বেসামরিক জনগণের জন্য বসবাসের অযোগ্য করে তোলার পরিকল্পিত তৎপরতাগুলো যুদ্ধ-অপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।

বিশ্লেষক ও সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাজায় স্থল-অভিযান চালিয়ে তা দখল করা হবে ইসরাইলের জন্য খুব কঠিন বা প্রায় অসাধ্য। এমনকি ইসরাইল অনেক ক্ষয়ক্ষতির বিনিময়ে গাজা দখল করতে সক্ষম হলেও সেখানে দখলদারিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হবে না বলে সামরিক বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন।